শব্দ দূষণ ও তার প্রতিকারে করণীয়


Untitled-1

♫ ডাকে পাখি খোল আখি, ♪ দেখ সোনালি আকাশ, ♩ বহে ভোরের ও বাতাস……..

দূরদর্শণ(টেলিভিশন) যন্ত্রে সকালের গান শুনতে শুনতেই ঘুম ভাঙ্গে শফিক সাহেবের(সাংবাদিক)।সব চ্যানেলেই এক সাথে সকালের অনুষ্ঠান শুরু হয়।ভিন্ন ভিন্ন নামে।কেউ বা ডাকে সুপ্রভাত বাংলাদেশ,কেউ বা ডাকে সকালের মোহনা নামে।আবার কেউবা ডাকে সকালের মাছরাঙা নামে।যায় হোক,সকালেই মিষ্টি একটা গান শুনে ঘুম থেকে ওঠা।দিনটা মনে হয় আজ ভালই যাবে।

রান্নাঘর থেকে বউ এর গলা শুনা যাচ্ছে…

-কয় গো।ওঠো।। অফিস যাবে না? টেবিলে নাস্তা দেওয়া আছে।

নাস্তা করেই বেরিয়ে পরে শফিক সাহেব। সাংবাদিকতা পেশা। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়। ইচ্ছে করে চাকরিটা ছেড়ে দি। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হাটছেন তিনি। হঠাৎ সম্বিত ফিরে ইট ভাঙ্গার তীব্র শব্দে। একটার পর একটা ইট নিমিষেই ভেঙ্গে ফেলছে। তার সাথে উৎপন্ন করছে কান ফাটানো শব্দ। আচ্ছা এটাকে কি শব্দ বলা যায়? শব্দ হলো এক ধরনের  তরঙ্গ  যা পদার্থের কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয়। পরিবেশের জন্য স্বাস্থ্যকর শব্দের তীব্রতা- ৬০ ডেসিবল| এইটার ডেসিবল কত হতে পারে? ১২০ নাকি আরো বেশি? কি জানি বাপু। যতই সামনে আগাচ্ছি ডবলার ক্রীয়ার প্রভাবে এর তীব্রতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কান চেপে কষ্ট করে সেই বিভীষিকাময় যন্ত্র পার হয়ে আসে শফিক সাহেব।কিছুদূর যেথেই কানে আসতে লাগল ঝগড়ার আওয়াজ।রাস্তার পাশের বস্তিতে ঝগড়া চলছে।পাশাপাশি দুই প্রতিবেশির মধ্যে ঝগড়া।নারী কন্ঠ,পুরুষ কন্ঠ সব কানে আসছে।আর একদল লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝগড়া দেখছে।যেন ওরা কতকাল কোন ঝগড়া দেখেনি! 😮

না!!!দূর…!! আর হাঠতে ইচ্ছা করছে না।

রিক্সা নিল শফিক সাহেব।কিছুদূর যেতেই পড়লো তীব্র জ্যামে।রাস্তা পুরা ব্লক।একটু ফাক ফোকরও নায়।গাড়ীগুলি দাঁড়িয়ে আছে।তার উপর অনবরত বাজাচ্ছে হাইড্রলিক হর্ণ।এ যেন প্রতিযোগিতা চলছে।কেউ যদি একটা হর্ণ দেয়।আর একজন দিবে তিনটা হর্ণ।আর একজন  বলবে,কিরে!আমার কি হর্ণ নায়?আমি এক ঢিলে চার পাখি মারবো।একবার চাপ দিলেই পোঁ-পোঁ-পোঁ-পোঁ করে চারবার বাঁজবে।আবার প্রতিযোগীতায় যাতে না হারে সেজন্যে অনেকে একটানা হর্ণটা চেপে ধরেই রাখে।আবার একটা এম্বুল্যেন্স অনবরত সাইরেন বাজিয়েই চলছে।কিন্তু বেচারাকে কেউ পাত্তাই দিচ্ছেনা।তার উপর যায়গায় যায়গায় ওয়াজ মাহফিলের মাইকের আওয়াজ।

প্রায় দুই ঘণ্টা শব্দের এ অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়ে অফিস পৌছাল শফিক সাহেব।মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।অথচ সকালটা কত সুন্দর করেই না শুরু হল।শব্দের অত্যাচারে আমরা কয় দিন ভুগব?না।কিছু একটা করতেই হবে।আজকে এটা নিয়েই আমি কলাম লিখব……।।

চরম বিরক্তিরকর, মেজাজ খিটখিটেকারী, পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্টকারী, অস্থিরতা বৃদ্ধিকারী, শ্রবণশক্তি বিনষ্টকারী, উচ্চরক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, পেপটিক আলসার এবং অনিদ্রাসহ বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী এক ঘাতকের নাম শব্দ দূষণ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলো বর্তমানে অতিমাত্রায় শব্দ দূষণে আক্রান্ত।শব্দদূষণ বলতে মানুষের বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী কোনো শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। যানজট, কলকারখানা থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী এরকম তীব্র শব্দের উৎপত্তি হয়।মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের হাইড্রোলিক হর্নের আওয়াজ শব্দ দূষণকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে।শব্দ দূষণ এমন এক মহামারি আকার ধারণ করেছে যে, মনে হচ্ছে এখান থেকে পরিত্রাণের আর কোন পথ নেই।যেখানে সেখানে আমরা গাড়ির হর্ন বাজাতে আমরা খুব পছন্দ করি ! রাস্তার সাইনবোর্ডে “ হর্ন বাজানো নিষেধ” দেখা সত্ত্বেও আমাদের গাড়ির চালকেরাও দিব্যি হর্ন বাজিয়ে যান।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতানুসারে, সাধারণত ৬০ ডেসিবল শব্দ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে ফেলতে পারে এবং ১০০ ডেসিবল শব্দ সম্পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে হিসাব করে দেখা গেছে যে, শহরের যেকোন ব্যস্ত সড়কে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবল, যানবাহনের শব্দ মিলে তা ৯৫ ডেসিবলতে দাঁড়ায়; লাউড স্পিকারের সৃষ্ট শব্দ ৯০ থেকে ১০০ ডেসিবল, কল কারখানায় ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবল, রেস্তোরাঁ এবং সিনেমা হলে ৭৫ থেকে ৯০ ডেসিবল, মেলা-উৎসবে ৮৫ থেকে ৯০ ডেসিবল, স্কুটার বা মটরসাইকেলের ৮৭ থেকে ৯২ ডেসিবল এবং ট্রাক-বাসের সৃষ্ট শব্দ ৯২ থেকে ৯৪ ডেসিবল, টেম্পুর হাইড্রোলিক হর্ন (৬০-৯০ ডেসিবল)। রেলগাড়ির হুইসেল (৯০-১১০ ডেসিবল), পটকা, বাজি (৯০-১২০ ডেসিবল), ডিজেল চালিত জেনারেটর (৮০ ডেসিবল), ঝগড়া বিবাদে পারস্পরিক উচ্চ স্বরে কথা বলার সময় (পুরুষের ১২০ হার্জ এবং নারীর ২৫০ হার্জ)।

কিন্তু শব্দের বাঞ্ছনীয় মাত্রা হলো: শয়নকক্ষে ২৫ ডেসিবল, বসবার ও খাবার ঘরে ৪০ ডেসিবল, কার্যালয়ে ৩৫-৪০ ডেসিবল, শ্রেণীকক্ষে ৩০-৪০ ডেসিবল, গ্রন্থাগারে ৩৫-৪০ ডেসিবল, হাসপাতালে ২০-৩৫ ডেসিবল, রেস্তোরাঁয় ৪০-৬০ ডেসিবল এবং রাত্রিকালে শহর এলাকায় ৪৫ ডেসিবল। যখন শব্দ এই সীমা অতিক্রম করে তখনই শব্দ দূষণ ঘটে।বাহ্যিকভাবে শব্দ দূষণ তেমন কোন ক্ষতিকর মনে না হলেও এটি মানুষের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। শব্দ দূষণ এক নীরব ঘাতক। এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের শতকরা ১০০ % লোক শব্দ দূষণের শিকার। ‘‘পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপ অনুসারে সহনীয় মাত্রার চাইতে বেশি শব্দ মানুষের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত শব্দ উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, পেপটিক আলসার এবং অনিদ্রার কারণ ঘটায়। যে কোনও স্থানে আধাঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে মাইকে ১০০ মাত্রার শব্দ দূষণের মধ্যে কাউকে থাকতে হলে তাকে সাময়িক বধিরতার শিকার হতে হবে। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে কাজ করলে যে কেউ বধির হয়ে যেতে পারে। যে কোনও ধরনের শব্দ দূষণ সন্তানসম্ভবা মায়ের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ। পরীক্ষায় দেখা গেছে লস এঞ্জেল্স, হিথ্রো এবং ওসাকার মতো বড় বিমানবন্দরের নিকটবর্তী বসবাসকারী গর্ভবতী মায়েরা অন্য জায়গার চাইতে বেশি সংখ্যক পঙ্গু, প্রতিবন্ধী ও অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়।’’ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. সোলায়মান খান বলেন, ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে কানের টিস্যুগুলো আস্তে আস্তে বিকল হয়ে পড়ে তখন সে স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পায় না। শিশুদের মধ্যে মানসিক ভীতি দেখা দেয়। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুসের কারোনারি হার্ট ডিজিজ হতে পারে।শব্দ দূষণ রোধের জন্য আমাদের দেশে আইনের কমতি নেই। কমতি রয়েছে প্রয়োগের। ২০০২ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সংস্থা (বেলা) শব্দদূষণ বন্ধে আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে। ২০০২ সালের ২৭ মার্চ উচ্চ আদালত হাইড্রোলিক হর্ন এবং বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী যে কোন ধরনের হর্ন গাড়িতে সংযোজনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং গাড়িতে বাল্ব হর্ন সংযোজনের নির্দেশ প্রদান করে। এই আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও প্রচলিত আছে। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ এর ২৫, ২৭, ২৮ ধারামতে শব্দদূষণ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অর্থদন্ড ও কারাদন্ড উভয়েরই বিধান রয়েছে।

চরম বিরক্তিকর, অসহ্য, অসহনীয়, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং হঠাৎ মেজাজ খিটখিটে করে পরিবেশ নষ্ট করার অন্যতম মাধ্যম হলো শব্দ। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের শহরগুলোতে গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন, গ্রামের হাটবাজারে হকারদের মাইক ও ক্যাসেট প্লেয়ার, টি স্টলগুলোতে উচ্চস্বরে টেলিভিশন, বিয়ে বাড়িতে মাইক ও ব্যান্ড পার্টি, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মাইক ও মিছিলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ করা হয় যা শুধু কষ্টকরই নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে সহ্যসীমা অতিক্রম করে যায়।অতচ আল্লাহর রাসূল (স.) শব্দদূষণের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে- হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স.) মসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় ছিলেন, তখন সাহাবীদের উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ শুনতে পেলেন। অতঃপর তিনি পর্দা সরিয়ে বললেন-নিশ্চয়ই তোমরা প্রত্যেকে আল্লাহর পরিবেশে শামিল। সুতরাং একে অপরকে কষ্ট দিবে না এবং কুরআন পাঠের সময় অথবা নামায পড়াকালীন একে অপর থেকে স্বরকে উঁচু করবে না। কালামে হাকীমে আল্লাহ বলেছেন, ‘‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাক কাকুতি-মিনতি করে এবং অতি সংগোপনে।একজন নিরপরাধ ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবে আর একজন গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে তাঁর শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দিবে এর জন্য তার কোন শাস্তি হবে না এটা হতে পারে না।

যদি সরকার একটি পদক্ষেপ নেয় তাহলে শব্দ দূষণরোধ অতি সহজ হবে। তাহলো, বিআরটিএ যখন একটি গাড়ির অনুমোদন দেয়, তখন গাড়ির হাইড্রোলিক হর্ন খুলে রেখে বিআরটিএ অনুমোদিত নির্ধারিত হর্ন লাগিয়ে দিবে। গাড়ি আমদানির সময় এসব হর্ন আমদানি নিষেধ করে দিবে। যারা নিষেধ শুনবে না তাদেরটি খুলে নির্ধারিত হর্ন লাগিয়ে দিবে। কোন গাড়ির জন্য কেমন মাত্রায় হর্ন ব্যবহার করা হবে তা বিশেষজ্ঞ দ্বারা বিআরটিএ নির্ধারণ করবে। এসব হর্ন দেশী কোন কোম্পানি দ্বারা তৈরি করবে। যদি তৈরি করতে না পারে তাহলে ঐ মাত্রার হর্ন বিআরটিএ আমদানি করে সরবরাহ করবে। মোট কথা, যে কোন গাড়িতে হর্ন লাগানোর দায়িত্ব বিআরটিএ’র একচ্ছত্র অধিকারে থাকবে। আর কোন ব্যক্তি বা কোম্পানী কোন অবস্থাতেই হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি করতে পারবে না। যদি কেউ বিআরটিএ কর্তৃক অনুমোদিত হর্ন ছাড়া অন্য কোন হর্ন ব্যবহার করে তাহলে পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্বরত পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারও করা যেতে পারে। এ আইন কার্যকর করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।তাহলেই শব্দ দুষণ রোধ করা এবং  একটি বধির জাতির উত্তরণে বাধা প্রদান করা সম্ভব।

Advertisements

3 thoughts on “শব্দ দূষণ ও তার প্রতিকারে করণীয়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s