ভূমিধ্বস ও পাহাড়ী এলাকায় মানুষের প্রাণহানি…(প্রেক্ষাপট চট্টগ্রাম)


পাহাড় আমাদের দেশের একটি অমূল্য সম্পদ।  এই পাহাড় হল বিভিন্ন প্রকার প্রাণি ও গাছের এক অপূর্ব মিলনমেলা। তবে এই সম্পদ যখন বিপদের স্মমুখীন হয় তখন তা মানুষের জন্যই ক্ষতি ডেকে আনে। ভৌগলিক দিক থেকে চট্টগ্রাম হল একটি পাহাড়ী এলাকা এবং সবচেয়ে মারাত্মক ও ভয়ংকর ভূমিধ্বসপ্রবণ এলাকা। এই ভূমিধ্বসের পেছনে অনেক কারন থাকলেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হল পাহাড় কাটা। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা হল অপরাধ। এই অপরাধের জন্য জরিমানা ও শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! :/

Hill cutting in KHULSHI
খুলসি এলাকায় পাহাড় কাটার চিত্র

ওই যে বলে না, যখন পেটের ক্ষুদা থাকে চরমে তখন আর নিয়ম কানুন কারো কাজে আসে না। যারা এই কাজের সাথে জড়িত তারা সবাই হল দিনমজুর, ফলে এসব পাহাড় নিধন সহজে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার আয়তন ১৮৫ বর্গ কিলোমিটার (৬০ বর্গ. মাইল) এবং রয়েছে একচল্লিশটি টি ওয়ার্ড ও ২৮৫ ক্লাস্টার। এর জনসংখ্যা ২৫,৬৩,২৯৩ জন। কিন্তু এই শহরের জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর এই বাড়তি জনসংখ্যার মধ্যে গরীব মানুষের সংখ্যা বেশি এবং তারা বসবাসের জন্য কোন জায়গা পায় না।। ফলে তারা ঘর নির্মাণের জন্য বেছে নেয় ঢাল বা পাহাড়ের পাদদেশ বা পাহাড় শীর্ষ  : কোন নিয়ম কানুন না মেনে।

বর্তমান অবস্থা :

চট্টগ্রামের খুলসি, লালখান বাজার, বায়োজিদ বোস্তামী, হাটহাজারী প্রভৃতি এলাকায় ভূমিধ্বসে প্রায় প্রতিবছরই মানুষ মারা যায়। এসব এলাকায় মানুষ জন উদবাস্তু হয়ে পাহাড়ের ঢালে ঝুকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করে। প্রতি বছর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় কিন্তু তাতে কোন লাভ হয় বলে মনে হয় না। কারন তারা আবার এসে ঠাই নেই ওইসব এলাকা তে…

Showing the housing development happened on hill by hill cutting in Motijorna area.
মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন

কিছু অর্থ-লোলুপ প্রভাবশালী মানুষ এবং সরকারের পাহাড় ও ভবন সংক্রান্ত কয়েকজন রুই কাতলা তাদের পাহাড়ের উপর অস্থায়ী ঘর তৈরী করে থাকতে দেয় এবং অর্থ উপার্জন করে। যার কারনে তাদের উচ্ছেদ অভিযান কখনও সফল হয় নি। পাহাড় কেটে বন ধংস করে তারা ঘরবাড়ী বানায় ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে মাটি ভেজা ও ভারী হয়ে পড়ে : যার ফলাফল ভূমিধ্বস। সম্প্রতি চট্টগ্রাম শহরে ভূমিধ্বস বেশি হচ্ছে পাহাড় কাটার ফলে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে খুলশী, পাঁচলাইশ, সেল্ফ শাহার, বাইজিদ বোস্তামী, ফয়’স লেক, লালখান বাজার, পাহাড়তলী, কাট্টলি ও পলিটেকনিক এলাকায়।  (Source : Landslide in Chittagong City: A Perspective on Hill Cutting… Journal of Bangladesh Institute of Planners Vol. 7, December 2014, pp. 1-17, Bangladesh Institute of Planners)

ফলাফল :

পাহাড় কাটার ফলে মাটির ধারন ক্ষমতা কমে যায় ফলে তা অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে পারে না এবং ভূমিধ্বস ঘটে।।  এছাড়া যখন বৃষ্টি হয়, পানি পাহাড়ের খনিজ উপাদান সমূহকে মিশিয়ে ফেলে যার কারণে মাটি আলগা হয়ে উঠে।।  পাহাড়ের মাটি বৃষ্টির পানি শুষে ভারী হয়ে উঠে।।  বৃষ্টির তীব্রতা খুব বেশী হলে, মাটি খুব দ্রুত ভেঙ্গে দিয়ে কাদায় পরিণত হয় এবং সক্রিয় ও খুব ভারী হয়ে ওঠে।। পাহাড়ের খাড়া ঢাল মাটি বা কাদা ভর ওজন সহ্য করতে পারে না যার ফলাফল ভূমিধ্বস।।

এর সাথে সম্পর্কিত খুব পরিচিত একটা সায়েন্টিফিক টার্ম হলঃ রান অফ রান অফ হল মাত্রাতিরিক্ত বর্ষনের ফলে পাহাড় বা কোন ঢালু জমি থেকে পানির প্রবাহ।।   বাংলাদেশে মূলত এই রান অফের কারনেই ভূমিধ্বস ঘটে।। 

watercycle_2

এছাড়া ও অনেক কারন আছে যেমন : ভূমিকম্প , অধিক হারে বৃক্ষ নিধন, যোগাযোগের এর জন্য রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি কারণে ভূমিধ্বস হতে পারে।।

অনেকেই মনে করেন পার্বত্য অঞ্চলে “জুম চাষ” ভূমিধ্বস এর অন্যতম কারন। কথা টা ঠিক। তারা জুম চাষ করার জন্য পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলে, ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে এসে পড়ে এতে ভূমিধ্বস এর সৃষ্টি হয়। ভূমিধ্বস এর ফলে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি তে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় সময়েই ঘটে। ওইসব এলাকায় ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মান পাহাড়ের ধার ঘেষে হয়, এবং পাহাড় ধসের ফলে জীবন ও সম্পত্তির চরম মূল্য দিতে হয়।

en02

ভূমিধ্বস রোধে করনীয়ঃ

• পানি ভূমিধ্বসের একটি প্রধান ফ্যাক্টর, তাই ভূপৃষ্ঠের এবং ভূগর্ভে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ভূমিধস-প্রবণ ঢালের স্থায়ীত্ব বাড়াতে পারে। পানি  এমনভাবে অপসারিত করা উচিত যাতে তা সংলগ্ন কোন স্থানে ভূমিধ্বস ঘটাতে না পারে।।  ভূ-উপরিস্থ পানি ভূমিধস-প্রবণ ঢালে ফেলার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।। map2

• যোগাযোগের জন্য পাহাড় কেটে সড়ক বানানো বন্ধ করতে হবে।।  কারণ পাহাড় ধ্বসের ফলে যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং জন দূর্ভোগ বৃদ্ধি পায়।।

Picture1

• গাছ, ঘাস এবং বনাঞ্চল মাটিতে সরাসরি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস করে। গাছপালা সারফেস রান অফ দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয় মন্থর, এবং মাটি থেকে পানি অপসারণ করতে পারে।। তাই আমাদের পাহাড়ী অঞ্চলের গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং গাছের পরিমান বাড়াতে হবে।।

• শুধু গাছ লাগিয়ে বা অন্যান্য পথ অবলম্বন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব না।  যারা পাহাড়ের তলদেশে বাস করে তাদের আলাদা বাসস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের ভূমিধ্বস সম্পর্কে ভাল ধারনা দিতে হবে।।

Advertisements