জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি……


সাধারণত জলবায়ু বলতে কোন নির্দিষ্ট স্থানের দীর্ঘ সময়ের, সাধারণত ২০-৩০ বছরের আবহাওয়ার বিভিন্ন অবস্থার গড়পড়তা হিসাবকে বোঝানো হয়। জলবায়ু সাধারণত বৃহৎ এলাকার নির্ণীত হয়ে থাকে। আর কয়েক যুগ থেকে কয়েক লক্ষ বছর পর্যন্ত কোন জায়গার গড় জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদী ও অর্থপূর্ণ পরিবর্তনকে জলবায়ু পরিবর্তন বলা যায়।। “জলবায়ু পরিবর্তন” সাম্প্রতিক সময়ের খুব আলোচ্য একটি বিষয়। সবাই জলবায়ু পরিবর্তন ও এর সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকর দিকসমূহ (যেমনঃ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি) এসব দিক নিয়ে আলোচনা করে কিন্তু আমাদের মত উন্নয়ন শীল দেশ গুলো তে জলবায়ুর প্রভাব যে স্বাস্থ্যে পড়ছে তা নিয়ে অনেকেরই মাথা ব্যাথা নেই।। নিঃসন্দেহে জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।।

জলবায়ু পরিবর্তন :

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ । ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সর্বমোট ২৫ লাখ মানুষ প্রভাবিত হয়েছে, ২৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫,৭০ কোটি আমেরিকান ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অধিকাংশ বিপর্যয়ই (৭৫%) চরম আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা জলবায়ু পরিবর্তন দ্বারা বর্ধিত হয়।

বন্যা, ভূমিকম্প, সুনামি, খড়া প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা বিগত দশকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানব স্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব ফেলেছে। ১৯৯০ এর দশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দরুন গোটা বিশ্বে প্রায় ছয় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে যার ৯৫ শতাংশ দরিদ্র দেশগুলিতে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত অক্ষ্ফাম রিপোর্ট মোতাবেক ১৯৮০র দশকে প্রতি বছর গড়ে ১২০টি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০তে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা অনুযায়ী, ২১০০ সাল নাগাদ যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন হেক্টর জমি প্লাবিত হতে পারে৷ সম্প্রতি সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের পানি পরিমাপ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় লবণাক্ত পানি সমতল ভূমির আরো ভেতরের দিকে চলে আসছে৷ ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে৷ বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে ইতিমধ্যে এ সমস্যা সনাক্ত করা হয়েছে৷ পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷

0,,17082285_303,00

মানব স্বাস্থ্য :

গবেষকরা প্রমান করেছেন যে স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে কিছু রোগের আবির্ভাব ও জটিলতা এবং অন্যান্য মানব স্বাস্হ্য সংক্রান্ত আশঙ্কার সুনিকট সম্পর্ক আছে। অনুমান করা হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন প্রতি বছর ১৫০,০০০ মৃত্যু এবং ৫ কোটি রোগের জন্য দায়ী। বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থা আন্দাজ করেছে পৃথিবীর রোগভোগের এক-চতুর্থ বায়ু, জল, মাটি আর খাবার দূষণের ফল।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, বায়ুমন্ডলের গড় তাপমান ১ ডিগ্রী ফারেণহাইট বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থার হিসেব অনুসারে ২০০০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ১৬০,০০০ জীবনের হানি ঘটেছে ও ৫.৫ কোটি সুস্থ জীবন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এই ক্ষতির সংখ্যা দ্বিগুন হয়ে ৩০০,০০০ জীবনহানি আর ১১ কোটি অসুস্থ জীবনে গিয়ে ঠেকবে।

আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতে এই মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। মৃত্যু এবং রোগের অধিক সংখ্যার কারন হল অপুষ্টি, উদরাময়, ম্যালেরিয়া, তাপপ্রবাহ এবং বন্যা। কিন্তু যে সমস্ত অঞ্চলে এই রোগগুলির প্রভাব কম সেখানেও বিশ্ব ঊষ্ণীভবনের প্রভাব পড়বে।

স্বাস্থ্যের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু প্রভাব হল: তাপতরঙ্গের অধিক কম্পাঙ্ক; বৃষ্টির নকশায় পরিবর্তনের ফলে জলাভাব; জলযুক্ত রোগের উচ্চতর ঝুঁকি; সাগর পৃষ্ঠের উচ্চ্তাবৃদ্ধির দরুন উপকূলবর্তী বন্যার বৃদ্ধি, ইত্যাদি।

সার্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মানব স্বাস্থ্য:

দিন দিন পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যাপক ভাবে। সম্প্রতি ন্যাশনাল ওশিয়ানিক এন্ড এটমোস্ফেরিক এডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) এর তথ্য অনুযায়ী খোদ ২০১৫ সালের তাপমাত্রা ২০১৪ সালের থেকে ০.০৯ ডিগ্রী বেশি।।

GlobalTemps_WarmestYears_2015_610

অতি সুক্ষ্ম এবং ধীর জলবায়ু পরিবর্তন ও মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। আমাদের বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবার ফলে সূর্যথেকে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি প্রবেশ করছে আমাদের পৃথিবীতে এবং মানুষ এর নানা ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টি করছে। আবহাওয়া জনিত ঘটনাগুলি বর্ধমান হারে চলতে থাকলে কিছু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। দ্রুত তাপমান পরিবর্তনের দরুন উষ্ণ বা শীতপ্রবাহ বর্তমানে ব্যাপক রূপ ধারন করেছে আর প্রকারান্তরে এরা নানা রকম মারণ ব্যাধি যথা উষ্ণ আক্ষেপ বা হাইপোথার্মিয়া ঘটায়।এগুলি হৃদ রোগ ও শ্বাসকষ্ট জনিত মৃত্যু হার বৃদ্ধির কারন। ।এর পিছনে কারন হল আমাদের শরীর এর বেশির ভাগ মেটাবলিজম মোটামুটি ৩০-৩৫° এর মধ্যে কাজ করে পুরোপুরি ভাবে কিন্তু যখন তাপমাত্রা ৫০° হয়ে যায়( যা এখন ঘটছে) শরীরের নিজস্ব ইম্যুনিটি পাওয়ার নষ্ট হয়ে যায় যার কারনে এসব স্বাস্থ্য ঝুঁকি ঘটে। মরণশীলতা ও হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যান হতে দৃষ্ট হয় যে অতি উষ্ণ দিনে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়, বিশেষতঃ নগরবাসী অতিবৃদ্ধ ও অত্যন্ত কম বয়সীদের মধ্যে।

সংক্রামক ব্যাধির পূনরাবির্ভাব :

আই.পি.সি.সি. অনুমান করেছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টির নকশার পরিবর্তনের ফলে যে সব অঞ্চলে পূর্বে রোগ বা রোগ বাহক ছিল না, সেখানে আরো বেশী রোগসহায়ক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাধির বিস্তার ত্বরান্বিত করে যার মূল কারণ উষ্ণতর বিশ্বতাপমান সেই ভৌগলিক সীমাবৃদ্ধি করে যাতে রোগ বহনকারী প্রাণী, পতঙ্গ ও জীবানু এবং এদের বাহিত জীবানু ও ভাইরাস জীবিত থাকতে পারে। আবহাওয়ার প্রকৃতি পরিবর্তন ছাড়াও জলবায়ু সেই সমস্ত রোগকে প্রভাবিত করে যা বাহক দ্বারা সংক্রামিত (যেমন মশা ) হয়।

বিশ্বের প্রধান মারক ব্যাধিগুলোর অন্যতম ব্যাধিগুলি জলবায়ু সংবেদনশীল। ২০০২ সালে দাস্ত (পাতলা পায়খানা), ম্যালেরিয়া বা প্রোটিন শক্তি অপুষ্টি এককভাবে গোটা বিশ্বে ৩৩ লক্ষ মৃত্যুর কারণ, যার ২৯ শতাংশ আফ্রিকা অঞ্চলে। উষ্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত মারণ ব্যাধিগুলো যেমন পশ্চিম নিল ভাইরাস, ওলাউঠা এবং লিমেরোগ দ্রুত উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে কারণ এই সব অঞ্চলের বর্ধিত তাপমান রোগের বাহকগুলো যেমন মশা, টিক এবং দন্তুর প্রাণীর (ভেক্টর প্রাণী ) জীবন ধারণের সহায়ক।

চরম ঘটনা সমূহ যথা বন্যা, ঝড়, খরা এবং অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকান্ড স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক হতে পারে। বন্যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং রাসায়নিক দূষকপদার্থ বহন করে, ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটায় এবং পতঙ্গাদির বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদী খরা এবং অন্তর্বর্তীকালীন ভারী বৃষ্টি পতঙ্গ এবং দন্তুর প্রাণীর সংখ্যা বিষ্ফোরণের সহায়ক। চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনাবলির সঙ্গে এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকায় নতুন ক্ষতিকারক অ্যালগির আবির্ভাব ঘটেছে। ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়া মহাদেশে ম্যালেরিয়া, বিভিন্ন জলবাহিত রোগসমূহ যথা হেপাটাইটিস এ, রক্ত আমাশয় এবং ওলাউঠার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

বাহক জনিত ব্যাধিসমূহ :

বাহক জনিত ব্যাধিসমূহ সেই সমস্ত সংক্রমণ যা সংক্রামিত পতঙ্গাদি যেমন মশা, ছারপোকা, এঁটুলি, বালিমাছি বা কালোমাছির দংশনে বাহিত হয়।

বহু ব্যাধির বাহক মশা তাপমান পরিবর্তনের ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। সহ্যসীমার মধ্যে পরিবেশের উষ্ণকরন তাদের প্রজন্মের হার বৃদ্ধি করে, রক্তপানের সংখ্যাবৃদ্ধি করে, প্রজন্মের মৌসুম দীর্ঘারিত করে এবং তাদের বাহিত জীবানুকুলকে দ্রুত পরিনত করে। মশককুল এবং তাদের বাহিত ব্যাধিসমূহ যথা ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু,  ভাইরাস এবং পশ্চিমনীল ভাইরাস বিশেষভাবে তাপমানের পরিবর্তন আর ভূমির উচ্চতাবৃদ্ধির সঙ্গে সংবেদনশীল। পতঙ্গ দংশনের হার এবং পতঙ্গের অভ্যন্তরে জীবানুর পরিনত হওয়া তাপমানের ওপর নির্ভরশীল, উভয় হারই বায়ুর উষ্ণীকরনের সঙ্গে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ও রোগ সংক্রমনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

জলীয় পরিবেশে, মত্স্য, শেলফিস এবং সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীগণ খাদ্যের প্রাথমিক রূপ আ্যালগি ভক্ষণ করে। মত্স্য শিকার কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই সব আ্যালগি ভক্ষণকারীদের সংখ্যা হ্রাস পেলে আ্যালগির ক্ষতিকারক  বৃদ্ধি ঘটবে। প্লাঙ্কটনের বৃদ্ধি ওলাউঠা বা অন্যান্য জীবানু পোষণ করতে সক্ষম যা সাঁতারুদের স্বাস্থ্য কিংবা মাছ ও শেলফিস ভক্ষণকারীদের স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর।

উচ্চ ভূমি অঞ্চলে বরফ গলার এবং হিমবাহগুলির পশ্চাদপসরনের ফলে মশা এবং উদ্ভিদরাজি উচ্চতর ভূমিতে অভিবাসিত হয়েছে। পতঙ্গ এবং পতঙ্গ বাহিত ব্যাধি সমূহ (যথা ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বর) উভয়েই ইদানিং আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার উচ্চভূমিতে পরিলক্ষিত হয়েছে। পাপুয়া নিউ গিনি বা মধ্য আফ্রিকার উচ্চ ভূমির গ্রামাঞ্চলে ম্যালেরিয়া একটি সমস্যায় পরিনত হচ্ছে। ১৯৯৮ সালে ২৩০০ মিটার উঁচু তুন্তুনানিতে (Mapstone, ২০০৯) ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ঘটে যদিও এই উচ্চতায় ম্যালেরিয়ার কোন পূর্ব ইতিহাস ছিল না। ৩,০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বাহক মশা দেখা গেলেও এখনো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৮০০-২,০০০ মিটারের উর্ধে ম্যালেরিয়ার মহামারী অবর্তমান। পূর্বে ডেঙ্গু রোগ বহনকারী মশা ৩,৩০০ ফুট উচ্চতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি কলম্বিয়ার এন্দিজ্ পর্বতে ৭,২০০ ফুট উচ্চতায় তাদের দেখা গিয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন রোগবহনকারী মশাদের বিস্তারে সাহায্য করছে কারণ পূর্বে যে সমস্ত অঞ্চল তাদের জীবন ধারণের অযোগ্য ছিল তা ক্রমশঃ সহনীয় হয়ে উঠেছে।

কীট নাশকদের বিরুদ্ধে মশার ও বহু ঔষধের বিরুদ্ধে পরজিবীগুলির প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, এবং এর কোন কার্যকরী টীকা নেই; অদূর ভবিষ্যতে আবিষ্কারেরও কোন সম্ভাবনা নেই। পরিবেশগত পরিবর্তন, তার সাথে বর্ধিত আবহাওয়ার পরিবর্তনশীলতা এবং উষ্ণীকরনের প্রবনতা এই রোগের বিস্তারে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা গ্রহন করছে বলে প্রতীয়মান হয়।

সরীসৃপগণ, পাখি, মাকড়সা, বাদুড়, লেডিবাগ ও পুষ্করনীর মত্স্য , মশা বা তার শুককীট খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে মশক দমনে সহায়তা করে। মশককূল এই সকল প্রাণীর পুষ্টির যোগানদার হওয়া সাত্ত্বেও কিছু সংখ্যক মশা ম্যালেরিয়া, পীত জ্বর, ডেঙ্গু ও বিভিন্ন প্রকার এনকেফেলাইটিস বাহন করে।

ডেঙ্গু জ্বর :

ম্যালেরিয়া বা পশ্চিমনীল ভাইরাসের ন্যায় ডেঙ্গু জ্বরও, যা প্রধানতঃ ৪ প্রকারের, মশাবাহিত। কিন্তু ম্যালেরিয়ার সঙ্গে বৈসাদৃশ্যে ডেঙ্গুরোগ বহনকারী মশা নাগরিক পরিবেশে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় (Nelson, ২০০৯)। চারটি প্রজাতির যে কোন একটির সক্রমণ কেবলমাত্র সেই প্রজাতির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং দুর্ভাগ্যবশতঃ অন্য প্রজাতির দ্বারা আক্রমনের সম্ভাবনা বর্ধিত হয় (ibid)। সর্বাপেক্ষা মারাত্মক প্রজাতি ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের (DHP) কারণ, যদি দ্রুত রোগ নির্ণয় না হয় ,এটা কদাচিত মৃত্যুর কারণ। এই রোগ দেহাভ্যন্তরীন যন্ত্রাদির ক্ষতি করে।

clip_image002

ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তিস্থল আফ্রিকায় এবং ১৩০তিরও বেশী প্রজাতির মশা দ্বারা উষ্ণ ও স্বল্প উষ্ণ অঞ্চলে বাহিত হয় (Tseng et al., ২০০৮)। প্রতি মৌসুমেই রোগ নথিভুক্ত হয়েছে এবং এর ব্যাপক বিস্তৃতি বহু দেশে, যথা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা, পশ্চিম প্রসান্ত মহাসাগরীর এলাকা (Tseng et al., ২০০৮)। ডেঙ্গু জ্বরের বর্ধিত ঝুঁকির সঙ্গে যে সমস্ত মাসের গড় তাপমান ১৮ ডিগ্রী সেন্তিগ্রেডের বেশী বা নগরীকরনের মাত্রার সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায় (Wu et al., ২০০৯)। তাপমান পতঙ্গের জীবনকাল, বাসভূমি, পরিনত হওয়ার ও সংক্রমনের সময়কালকে প্রভাবিত করে। উচ্চতর তাপমান ভাইরাসের ইনকিউবেশন কাল কমায় ও পরিনত হওয়ার হার বৃদ্ধি করে (ibid)। ডেঙ্গু জ্বরের দায়ী মশা অ্যডিস ইজিপ্টি ছোট প্রাকৃতিক জলাধারে, যেমন বৃক্ষ কোটরে কিংবা প্রস্তরাভ্যন্তরীন জলাধারে বংশ বৃদ্ধি করে (Phillips, ২০০৮)। বর্তমান এরা জঞ্জালে জমা জলেও (বোতল, প্লাস্টিক, টায়ার) বংশ বৃদ্ধি করে। উপরন্তু এই প্রজাতির মশা বাইরে অপেক্ষা গৃহাভ্যন্তরে থাকতে পছন্দ করে এবং পশু অপেক্ষা মানুষের রক্ত পানে আসক্ত। সুতরাং বলা যায় এই মশককুল নাগরিক পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে (ibid)।

গবেষকগণ এক দশকের অধিক সময় ধরে মেক্সিকোর মাতামরস ও তামাওলিপাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ওপর সুক্ষ্ম জলবায়ু এবং ENSO সম্পর্কিত আবহাওয়ার প্রভাব পর্য্যবেক্ষণ করেছেন (Brunkard, et al., ২০০৮)। তারা লক্ষ্য করেছেন যে সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ তাপমান প্রতি ১ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধির এক সপ্তাহ পরে ডেঙ্গুর আক্রমণ ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (ibid)। প্রতি ১ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমান বৃদ্ধির পরেও ডেঙ্গুর হার ১৯.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (ibid)। এই সমস্ত ফল নির্দেশিত করে যে জলবায়ুগত কারণসমূহ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে জড়িত যদিও অধিকাংশ প্রমানাদি এখনও আভাসিত করে যে অজলবায়ুগত কারণসমূহ মশকবাহিত রোগে বৃহত্তম ভূমিকা গ্রহন করে (ibid)।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার বৃষ্টিপাত হ্রাস এবং এই আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভবনায় এই অঞ্চল শুষ্ক হয়ে উঠেছে (Beebe et al, ২০০৯)। জলসরবাহের চাপ কমাতে সরকার গৃহে বৃহৎ জলাধার স্থাপনে উৎসাহ দান করেছে। তবে এই সব জলাধার মশার বংশবৃদ্ধির পক্ষে আদর্শ এবং বিশেষজ্ঞরা এই ভেবে অশঙ্কিত যে নিকটবর্তী ডেঙ্গুপ্রবল কুইন্সল্যান্ড হতে এতদঞ্চলে ডেঙ্গুর পূনরাবির্ভাব ঘটতে পারে (Beebe et al, ২০০৯)। এক্ষেত্রে ডেঙ্গুর আশঙ্কা সরাসরি উষ্ণতর তাপমানের সঙ্গে যুক্ত নয় কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের উপর জনগনের প্রতিক্রিয়া এবং তার ফলপ্রসূত প্রভাব হতে উদ্ভূত।

তবে এটা উল্লেখযোগ্য যে ব্যাধির বহিঃপ্রকাশে জলবায়ুর ভূমিকাকে অবজ্ঞা করা সমুচিৎ নয় (Brunkard, ২০০৮)। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে প্রকাশ পেয়েছে যে সকল অঞ্চলে সম্প্রতি রোগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, সেখানে রোগ এবং জলবায়ুর একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে (ibid)। জনস্বাস্থ্য অধিকারীগণ লক্ষ করেছেন যে বর্ষার প্রারম্ভে এবং উষ্ণ তাপমাত্রায় ডেঙ্গু রোগের অধিকতর আক্রমণ ঘটে। ডেঙ্গু কিভাবে সংক্রামিত হয় সে ব্যাপারে প্রশ্ন করলে আমেরিকা-মেক্সিকো সীমানার অধিবাসী এই প্রকার জবাব দেবেন “এখানে সব সময় গরম তাই মশা মরে না” অথবা “আমি জানি না। মানে হয় মশা। হঠাৎ বর্ষা আসে আর ডেঙ্গুও এসে হাজির হয়।”

অন্যান্য বাহক জনিত রোগের উদাহরণ:

  • ওলাউঠা- সংক্রামিত খাদ্য কিংবা পানীয় জল হতে এর প্রাদুর্ভাব ঘটে। এর শেষ বহিঃপ্রকাশ ইরাকে (আগস্ট ২০০১)
  • চিকুনগুনিয়া- ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে আবিষ্কৃত হওয়া এই ভাইরাস লা রিইউনিয়ন দ্বীপে ২৩৭ জনের মৃত্যু ঘটায় এবং দ্বীপের এক তৃতাংশ অধিবাসীর সংক্রামিত হওয়ার কারণ হয়

শহুরে পীতজ্বর- কেবলমাত্র আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে দেখা যায়।

এঁটুলি বাহিত এনকেফেলাইটিস (TBE) :

বিগত ৩০ বছরে এঁটুলি বাহিত এনকেফেলাইটিস রোগের সংখ্যা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (Rizzoli, ২০০৯)। এই রোগের বাহন Ixodes ricinus নামক কঠিন এঁটুলি এবং শুষ্কতা নিবারণের জন্যে এরা ৮০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতার উপর নির্ভরশীল (Grey, ২০০৮)। ছায়াছন্ন এবং উদ্ভিদাকীর্ণ অঞ্চলে শুষ্ক মরসুমেও ভূমিতল সদা আর্দ্র থাকে এবং এই রোগের জীবানুকে বেঁচে থাকতে উৎসাহিত করে (ibid)। সুইডেনে এঁটুলির প্রাচুর্য হালকা শীত এবং প্রলম্বিত বসন্ত ও শরৎকালের সঙ্গে সম্পর্কিত (ibid)।

বিগত দশকে এই রোগের সঙ্গে ভূমি উচ্চতার সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটেছে (Grey, ২০০৮)। ১৯৫৭ এবং ১৯৭৯- ৮০ সালে সমুদ্রপিষ্ঠ হতে ৭০০ মিটার উচ্চতা পর্য্যন্ত এঁটুলির প্রকোপ ছিল । কিন্তু ২০০১ এবং ২০০২ সালে সমুদ্রাপ্রিষ্ঠ থেকে ১১০০ মিটার উচ্চতেও এদের দেখা মেলে। ১৯৫৭-১৯৮৩ পর্য্যন্ত গবেষকরা উপলব্ধি করেছেন যে উচ্চতর উচ্চতায় এঁটুলি পোকা তাদের জীবনচক্র সম্পুর্ন করতে অক্ষম। পূর্বে এদের বিস্তার ছিল ফ্রান্স, দক্ষিম-পশ্চিম ইংল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া ও মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত। এদের সীমারেখা ছিল উত্তরে জার্মানি, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া আর দক্ষিনে ভূমধ্যসাগরীয় তটভূমি। ১৯৭৬ সালে ৩০০০টি স্থানের মধ্যে মাত্র চারটি তে TBE রোগ সূচিত হয় (ibid)। ২০০৩ সালে ২৬টি স্থানে TBE রোগ সূচিত হয় কিন্তু এই সব অঞ্চলে এঁটুলির অবস্থিতি জ্ঞাত ছিল (ibid)। ২০০৪ সালে ১৪টি স্থানে এই রোগ সূচিত হয়, যার মধ্যে মাত্র ২ টি স্থানে এঁটুলির আবির্ভাব পূর্বেই জ্ঞাত ছিল। এই সমস্ত ফল নির্দেশ করে যে জার্মানি, হাঙ্গেরি, সুইজারল্যান্ড ও নেদারলান্দের নতুন নতুন অঞ্চলে এঁটুলির বাসস্থান ছড়িয়ে পরেছে।

TBE রোগের হার বৃদ্ধির কারন স্বরূপ সুত্রগুলি বিভিন্ন উৎপাদকের দিকে নির্দেশ করেছে যেমন হরিনের সংখ্যাবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের ব্যবহার ইত্যাদি। জলবায়ু পরিবর্তনকৃত উষ্ণতর তাপমান পূর্ণবয়ষ্ক এঁটুলিকে শীতকালে জীবনধারণের সহায়তা করে এবং এর বিচরণভূমির দক্ষিণ অংশে জীবনচক্র পূর্ণ করতে সাহায্য করে (Grey, ২০০৮)। বৃষ্টিপাতের নকশার পরিবর্তনের সঙ্গে এঁটুলির প্রাচুর্য্যের পরিবর্তন ঘটে (ibid)। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন অঞ্চলকে বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করে, কোন অঞ্চলে এঁটুলির আধিক্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অন্যত্র হ্রাস পেয়েছে। খুব সম্ভবত এঁটুলির আধিক্য চিরস্থায়ী অভিবাসন জনিত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কিছু অঞ্চলে এঁটুলির জীবনধারণ সহজতর হয়েছে।

উত্তর ইউরোপে বনাঞ্চল এবং তার ব্যবস্থাপক পরিবর্তিত হয়েছে, জলবায়ু পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে এবং রো ও লাল প্রজাতির হরিণের সংখ্যা যথাক্রমে ২০০০ ও ৫০০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (Rizzoli, ২০০৯)। Rizzoli et al. (২০০৯) একটি গবেষণায় এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ স্বরূপ কয়েকটি অনুমান করেছেন; যেমন ক্ষুদ্র বনভূমিকে যুক্ত করে উচ্চ ও বৃহৎ বনাঞ্চল সৃগুন করা, আর হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ এঁটুলির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। তবে হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে এঁটুলির সংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক অকিঞ্চন, বরং সম্ভবতঃ ক্ষুদ্র স্তন্যপারীরা বনভূমির গঠন পরিবর্তনের ফলে লাভবান হয়েছে (ibid)।

TBE র আধিক্যের কারণ হিসেবে ভিন্ন মতগুলির মধ্যে আছে বিংশ শতাব্দীতে কমিউনিস্ট শাসনের পতন এবং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার বিলোপ, অর্থনৈতিক উন্নতি, ভূমির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বানিজ্য ও ভ্রমণ, প্রযুক্তি এবং শিল্প, মানুষের ব্যবহার, জনসংখ্যা সম্পর্কিত, ও জীবানুর পরিবর্তন এবং খাপখাওয়া (Randolph, ২০০৭)।

বিশেষতঃ বাল্টিক অঞ্চলে, যদিও পরিস্থিতি প্রায় অনুরূপ, TBE র প্রাদুর্ভাবের হার পরিবর্তনের নকশা ভিন্ন। কৃষিকর্ম বড় থেকে ছোট হয়েছে যার অর্থ পরিস্থিতি তীক্ষ্ণদন্তীদের বসবাসের অনুকুল হয়েছে। কিটনাশকের ব্যবহারও হ্রাস পেয়েছে।

অন্য অনেক রোগের মতো এঁটুলি বাহিত এনকেফেলাইটিসের কারণ বহুমুখী। TBE র বৃদ্ধি, বিস্তার, পারিপার্শিক, বাসস্থান এবং বাহকের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসুত্র আবিষ্কারের জন্য আরও গবেষনার প্রয়োজন।environment-changes-health

Source: Climate change and infectious diseases, World Health Organization

 অতএব, দেখা যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন কিভাবে আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।।  তাই আমাদের উচিত মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে জলবায়ু পরিবর্তনের হার যতটুকু সম্ভব কমিয়ে আনা ।।

কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাংলাদেশের জন্য বাস্তবতা। এ পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে লবণাক্ততা কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার নানামুখী পদক্ষেপ। এ সকল উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আকারে নদী ড্রেজিং, লবণ সহিষ্ণু ধান ও সবজির জাত উদ্ভাবন। এছাড়া পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি যা অনেক রোগ জীবাণুর পক্ষে সহায়ক তা যতটুকু সম্ভব কমিয়ে আনা , যাতে ভেক্টর অণুজীব সমূহ সংখ্যায় বাড়তে না পাড়ে ।

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s