প্লাস্টিক বর্জ্য ও সামূদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির দ্বারপ্রান্তে……(Plastic is killing our marine ecosystem)


সুন্দর ও সুস্থ ভাবে বাঁচার প্রথম শর্ত হল দূষণ মুক্ত পরিবেশ। আর এই পরিবেশকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের কথা উঠলে সবার আগে আসে নদী ও সাগর দূষনের কথা। সাগর ও নদী দূষণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের সাগর-মহাসাগরগুলোর ভূমিকা অনেক। জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় প্রধানতম নিয়ামক এই সমুদ্র বিপুল জীববৈচিত্রের আধারও বটে। বিশ্ব অর্থনীতির সাথেও সাগরের সম্পর্ক নেহায়েত কম না। কিন্তু মানুষের ফেলা সিগারেটের ফিল্টার থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের ব্যাগ, নানা ধরনের মোড়ক, বোতল ও ক্যানে দূষিত হচ্ছে সাগর-মহাসাগর।

How-Plastic-is-Killing-the-Ocean-Marine-Life-and-Eventually-Us-Trash-Mound

জীবনযাত্রা আধুনিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সমুদ্রে বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ৷ প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহারের পর তার বিশাল একটা অংশ চলে যাচ্ছে সমুদ্রে, যা বিপন্ন করছে সেখানকার জীববৈচিত্রকে৷এছাড়া জলযানের ভাঙ্গা অংশ, তেল-মবিল, তৈলজাত দ্রব্য সামগ্রী সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদী ও সাগরে। আজ মাছসহ জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নূ্ন্যতম অক্সিজেন নেই। প্রতিনিয়ত বাতাসে মিশ্রিত হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড যা প্রাণী বৈচিত্রের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার গাছপালা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা ব্যাধিতে।

প্রতিদিন আমাদের ফেলা নানা আবর্জনায়- বিশেষত প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য পদার্থে দূষিত হচ্ছে আমাদের সাগর-মহাসাগর। যার বিষে অকালে মারা যাচ্ছে সামুদ্রিক পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, কাছিম, মাছসহ নানা ধরণের সামুদ্রিক জীব। নষ্ট হচ্ছে জলজ লতা-গুল্ম উদ্ভিদ-প্রবাল।

সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে উঠে এসেছে সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্যের আকার কতটা ভয়ংকর.রুপ ধারণ করেছে। নতুন গবেষণা পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে পৃথিবীর সমুদ্রের মধ্যে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২৬৯,০০০ টন ওজনের পাঁচ ট্রিলিয়নের অধিক প্লাস্টিকের টুকরা ভাসছে। যা খাদ্য শৃঙ্খলের ক্ষতি ঘটাচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ড থেকে প্রশান্ত মহাসাগর, ব্রাজিল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার মহাসাগর, অস্ট্রেলিয়ান উপকূল থেকে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন অংশে ভেসে চলেছে প্লাস্টিক।

প্রশান্ত মহাসাগরে বিশাল এক এলাকা জুড়ে বছরের পর বছর ধরে জমা হয়ে আসছে প্লাস্টিক বর্জ্য। পরিস্থিতি এখন এমনই যে, প্রায় ৫০ ফুট লম্বা ‘দ্বীপ’ তৈরি করে ফেলেছে এসব প্লাস্টিক।

How-Plastic-is-Killing-the-Ocean-Marine-Life-and-Eventually-Us-Great-Pacific-Garbage-Patch

রিপোর্টের তথ্য সংগ্রহ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চিলি, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, প্লাস্টিকের অধিকাংশই ‘মাইক্রো প্লাস্টিক’ এবং তাদের পরিমাপ ৫ মিলিমিটারের কম। আর সমুদ্রে ৫.৫টন ভাসমান প্লাস্টিকের যে হিসেব উল্লেখ করা হয়েছে এটা মোট প্লাস্টিক কণার ছোট অংশ।

মূলত খাদ্য এবং পানীয় প্যাকেজিং এবং পোশাক পণ্য থেকে আহরিত প্লাস্টিকের টুকরাই বেশি পাওয়া গেছে সাগরে। পাঁচটি মহাসাগরে ছয় বছর ধরে ১৫৭১টি স্থানে ২৪টি অভিযান থেকে সংগৃহীত তথ্য থেকে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। মোট বর্জ্যের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পাওয়া গেছে ৬৮০ টন। আর রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়েছে ‘প্যালোস’(PLoS) জার্নালে। পৃথিবীর সমুদ্রের মধ্যে সব আকারের প্লাস্টিকের উপর চালানো প্রথম গবেষণা এটি।

alaska-plastic-pollution2

বড় টুকরাগুলো তিমির মতো বড় মাছ এবং ছোট টুকরোগুলো ছোট মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং অনেক সময় মানুষের শ্বাসরোধ হওয়ার মতো এই প্রাণীরও সেটা হতে পারে। একইভাবে প্লাস্টিক মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রাসায়নিক, পাশাপাশি তারা(সামুদ্রিক প্রাণী) সামুদ্রিক পরিবেশে একবার প্লাস্টিক আকর্ষণে আকৃষ্ট হলে সেটা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হবে। শুধুমাত্র প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী মারা যাচ্ছে। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক গবেষক জুলিয়া রেইসার বলেন, ‘আমরা মাছ ধরে দেখেছি তাদের পাকস্থলিতে গ্রহণ করা প্লাস্টিক ব্যাগ আছে এবং একই অবস্থায় কচ্ছপও দেখেছি। কিন্তু এতে রাসায়নিক প্রভাব আছে। পানির মধ্যে প্লাস্টিকের তৈলাক্ত দূষণ চুম্বকের মতো কাজ করে।

images   images 2    images 4

সাগরে যে পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য আছে সেটা প্রাথমিকভাবে ঠাহর করা কঠিন। গবেষকরা বলছেন, কেউ যদি একটা জাল নিয়ে আধা ঘন্টার জন্য সাগরে ঘোরে তাহলে কিছুটা অনুমান করতে পারবে। এটির ওজন মানুষের সমগ্র জৈববস্তুপুঞ্জের চেয়ে বেশি। এটা খুবই ভীতিকর সমস্যা।

গবেষণায় পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সারা বিশ্ব থেকে প্লাস্টিকের ভাসমান বর্জ্য একসাথে কত এবং সাগর ধ্বংসাবশেষের প্রবণতার পরিমাণ ভবিষ্যতে চার্ট আকারে করা হবে। গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বের মোট প্লাস্টিকের মাত্র ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত হচ্ছে। আর প্লাস্টিকের বিজ্ঞাপন ক্রমবর্ধমান উৎপাদন বৃদ্ধিরই পূর্বাভাস দিচ্ছে।

তবে এই ধরণের প্লাস্টিক বর্জ্যও কিন্তু এক ধরণের প্রাণীর জন্য উপকার বয়ে আনছে৷ সমুদ্রের পানিতে ক্ষুদ্র এই কীটের বৈজ্ঞানিক নাম  হ্যালোবেটস সেরিসেউস৷ এক সেন্টিমিটার লম্বা ও শরু এই কীটের রয়েছে বিশাল বিশাল পা৷ পানিতে ভেসে চলা নানা প্লাস্টিকে এরা ডিম পাড়ে৷ প্লাস্টিক পানির চেয়ে হালকা হওয়ায় তা ডোবে না৷ তাই তাদের ডিমগুলোও থাকে অক্ষত৷ এই ব্যাপারে মার্টিন থিল জানালেন, ‘‘এগুলো পানিতে ভেসে চলা শৈবাল, কাঠের টুকরা কিংবা ছোট ছোট অক্টোপাসের খোলস হতে পারে৷ এছাড়া অনেক ক্ষুদ্র পাথরের কণা যেগুলো পানিতে ভাসতে পারে, সেগুলোতে এই কীট ডিম পাড়ে৷”

প্রকৃতির এই নিয়মটা বড়ই অদ্ভুত৷ একই জিনিস হয়ত কারো জীবন কেড়ে নেয়, আবার সেটাই কারো বাঁচার উপায় হয়ে ওঠে৷

প্লাস্টিক সমস্যার সমাধান হলো বায়োপ্লাস্টিক

0,,16728646_303,00বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগ উদ্ভিদ পদার্থের মতোই পচে যায়৷ তা সত্ত্বেও বায়োপ্লাস্টিকের ফয়েল সহজে ছেঁড়ে না; তার উপর ছাপা যায়; মেশিনে কাট-ছাঁট করা যায়৷

প্যাকিং বিশেষজ্ঞ হ্যার্বার্ট পিয়েডে-র মতে, বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগের কারণে শহরে আবর্জনার পরিমাণ বাড়ে না: ‘‘বায়োপ্লাস্টিক ব্যাগের সুবিধা হলো এই যে, তা সাধারণ প্লাস্টিক ব্যাগের মতো সরানো বা পোড়ানোর কোনো দরকার পড়ে না৷ কাজেই বায়োপ্লাস্টিকের রিসাইক্লিং-এর জন্য আলাদা করে কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই৷ বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগ কিছুকাল পরে নিজে থেকেই পচে যায়, কাজেই তা আলাদা করে অপসারণ করতে হয় না৷”

বায়োপ্লাস্টিক তৈরিতে আরো কম ধাতব কিংবা খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হয়৷ এছাড়া বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগে রান্নাঘরের অর্গানিক জঞ্জাল জমিয়ে সবটাই নির্দিষ্ট অর্গানিক আবর্জনার জায়গায় ফেলা যায়৷ কিন্তু সেটা নিষিদ্ধ, কেননা জার্মানিতে নানা ধরনের আবর্জনা আলাদা আলাদা কনটেনারে ফেলার কথা৷ কাজেই অর্গানিক-আবর্জনা থেকে প্লাস্টিক বার করে নিতে হবে – বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগও যার মধ্যে পড়ে৷

মিশ্র সার কারখানার ওভারসিয়ার সিলভিও বুশ বলেন: ‘‘শুধু ব্যাগগুলো দেখে কী ধরনের প্লাস্টিক, তা বলার উপায় নেই৷ ওটা একটা সাধারণ প্লাস্টিকের ব্যাগ কিনা, কিংবা বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগ কিনা৷ আমাদের পক্ষে আর সেটা বোঝার উপায় নেই৷” কাজেই অর্গানিক-আবর্জনা থেকে সব ধরনের প্লাস্টিক বার করে নিতে হবে৷

জার্মানিতে গোড়ায় বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগের খুব চল হওয়ার পর এখন সেটা আবার কমে এসেছে৷ কেননা সেই ব্যাগের দাম বেশি৷ কাজেই এখন পিয়েডের কারখানায় নীলপরী মার্কা ব্যাগ তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যে ধরনের ব্যাগের আশি শতাংশই রিসাইক্লিং করা সম্ভব৷

ওমার কোম্পানি লিমিটেডের সিইও পিয়েডে বলেন: ‘‘যেখানে ভালো রিসাইক্লিং পদ্ধতি আছে, সেখানে নীলপরী মার্কা ব্যাগ তৈরি করাটাই ভালো বিকল্প৷ যেখানে কোনো রিসাইক্লিং প্রণালী নেই, সেখানে বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করার অর্থ আছে বৈকি৷”

কাজেই জার্মানিতে না হলেও, যে সব দেশে প্লাস্টিকের আবর্জনা ধীরে ধীরে একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে বায়োপ্লাস্টিকের ব্যাগ একটা সমাধান হতে পারে৷ কেননা বায়োপ্লাস্টিক সত্যি-সত্যি কয়েক বছরের মধ্যে পানি আর কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসে পরিণত হয়৷

সূত্র : http://www.dw.com/ 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s